ন্ধকার গুহার স্যাঁতসেঁতে ভেতরের দিকে বা ঘন জঙ্গলের ঝোপের নিচে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত জীবনচক্র। সেখানে এমন কিছু প্রাণী বিচরণ করে যাদের শরীরের ভেতরে বয়ে চলে মারাত্মক বিষ, যা একজন মানুষকেও মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। অথচ সেই বিষের কোনো প্রভাব তাদের নিজেদের শরীরে পড়ে না। এটি যেন প্রকৃতির এক চরম প্রহসন, যেখানে শিকারের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রটিই শিকারী নিজেকে আঘাত করতে পারে না। এই বিস্ময়কর ক্ষমতা কেবল সাপ, মাকড়সা বা বিছেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কিছু ব্যাঙ, পাখি এমনকি স্তন্যপায়ীর মধ্যেও এই প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা যায়। কিন্তু কেন? কেন বিষ খেয়েও বা শরীরে বিষ উৎপাদন করেও তারা মারা যায় না?

জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় 'ভিসন রেসিস্ট্যান্স' বা বিষ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এর পেছনের রহস্য লুকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন এবং জেনেটিক কোডিং-এর মধ্যে। বিষ বা ভেনম সাধারণত এমন কিছু প্রোটিন দিয়ে তৈরি যা শরীরের নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে। এই প্রোটিনগুলো কাজ করার জন্য শরীরের নির্দিষ্ট কিছু রিসেপ্টর বা গ্রাহক কোষের সাথে যুক্ত হয়। রিসেপ্টরকে কল্পনা করুন একটি তালা হিসেবে আর বিষকে তার চাবি হিসেবে। যখন চাবিটি সঠিক তালায় প্রবেশ করে, তখনই বিপদ সংকেত শুরু হয়।

উজ্জ্বল কমলা রঙের বিষাক্ত ডার্ট ব্যাঙ  একটি সবুজ পাতার উপর বসে আছে।
ছবি: ক্রিশ্চিয়ান সানচেজ।

কিন্তু যে প্রাণীরা এই বিষ প্রতিরোধ করে তাদের শরীরে এই 'তালা' বা রিসেপ্টরগুলোর গঠনের সামান্য পরিবর্তন ঘটে গেছে। যেমন, কিছু সাপ নিজেদের বিষের প্রতি কেন অভ্যস্ত বা ইমিউন? বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখেছেন যে তাদের স্নায়ু কোষের রিসেপ্টরগুলো এমনভাবে মিউটেটেড বা পরিবর্তিত হয়েছে যে বিষের প্রোটিন চাইলেও সেই রিসেপ্টরের সাথে সঠিকভাবে যুক্ত হতে পারে না। চাবিটা তালাতে ঢোকার মুখে সামান্য বাঁকা বা ভুল হয়ে যায়, ফলে তালাটি আর খোলে না। বিষের পুরো লোড শরীরে থাকা সত্ত্বেও তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, কারণ তার লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট প্রোটিনকে সে চিনতে পারে না। এটি একটি জিনগত কৌশল যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাণীটি তার শিকারী বা শিকারের বিরুদ্ধে নিজেদের বাঁচাতে তৈরি করেছে।

কেবল জিনগত পরিবর্তনই একমাত্র কারণ নয়, কিছু প্রাণীর শরীরে রয়েছে অ্যান্টিডোট বা বিষনাশক তৈরি করার আশ্চর্য ক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ, কিছু ওপোসাম বা উত্তর আমেরিকার একটি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী সাপের বিষ হজম করে ফেলতেও সক্ষম। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে ওপোসামের রক্তে এমন কিছু অ্যান্টি-ভেনম প্রোটিন বা প্রতিরোধকারী প্রোটিন রয়েছে যা দ্রুত বিষের টক্সিনগুলো ধরে ফেলে এবং তাদের ক্ষতিকারক প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই ভেঙে দেয়। এটি অনেকটা এমন যে শরীরের নিজস্ব সেনাবাহিনী বিষের অণুগুলোকে দ্রুত পাকড়াও করে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা এই ক্ষমতা অর্জন করেছে তাদের জীবনযাত্রার কারণে। ওপোসাম প্রায়শই বিষধর সাপ শিকার করে খায়, তাই প্রকৃতির চাপে তাদের শরীর এই আত্মরক্ষার মেকানিজম বা পদ্ধতি তৈরি করে ফেলেছে।

একটি লাজুক অপোসাম কাঠের বেড়াঁর উপরে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ছবি: আজানা।

আরেক ধরণের প্রাণী আছে যারা সরাসরি বিষ উৎপাদন না করেও, বিষাক্ত খাবার খেয়ে সেই বিষ নিজেদের শরীরে জমা রাখে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো রঙিন ডার্ট ফ্রগ বা বিষাক্ত ব্যাঙ। এই ব্যাঙেরা নিজেরা বিষ তৈরি করে না, বরং তারা যে বিশেষ ধরণের পোকা বা পিঁপড়া খায়, সেই খাবার থেকেই টক্সিনগুলো নিজেদের ত্বকের গ্রন্থিতে সঞ্চয় করে। পোকা-মাকড়ের এই বিষ তাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয়, কিন্তু তাদের ত্বক স্পর্শ করলেই অন্য যেকোনো প্রাণীর জন্য তা মারাত্মক হতে পারে। এই ব্যাঙদের কোষগুলি বিষকে শোষণ করার ক্ষমতা রাখে এবং তাদের জীবনতন্ত্রকে কোনো ক্ষতি না করেই বিষকে একপ্রকার স্টোরহাউস বা গুদামে ভরে রাখে আত্মরক্ষার জন্য। এটি তাদের শিকারীদের জন্য এক নীরব সতর্কতা।

এই বিস্ময়কর বিষ প্রতিরোধ ক্ষমতার গবেষণা মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানেও দারুণ আশা জাগাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন ওপোসামের রক্তে পাওয়া সেই অ্যান্টি-ভেনম প্রোটিনের কাঠামো বুঝতে এবং সেগুলোকে সিনথেটিক্যালি বা কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে। এটি সফল হলে সাপের কামড়ের চিকিৎসা বা অ্যান্টডোট তৈরির পদ্ধতি আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতির এই রহস্যময় ক্ষমতা শুধুমাত্র সেই প্রাণীগুলোর জীবন রক্ষা করছে না, বরং এটি আমাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বিষ খেয়েও বা বিষ উৎপাদন করেও বেঁচে থাকার এই ক্ষমতা আসলে বিবর্তনের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যেখানে জীবন টিকে থাকার জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে।